ঢাকা | মঙ্গলবার | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

অবকাশের পর হেভিওয়েট মামলার উত্তাপ সুপ্রিম কোর্টে

spot_img

প্রায় দেড় মাসের অবকাশকালীন ছুটি শেষে আজ রোববার খুলছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের পদচারণায় আবার মুখরিত হবে আদালত অঙ্গন। খোলার পরপর বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ও আদেশ হওয়ার কথা রয়েছে। এসব মামলা নিয়ে সরগরম থাকবে আদালতপাড়া। এ নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে রাজনৈতিক অঙ্গনেও।

বহুল আলোচিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড সংক্রান্ত ৫৪ ধারার রিভিউয়ের অধিকতর শুনানিসহ বিভিন্ন আলোচিত ইস্যুতে রিট মামলার শুনানিও রয়েছে হাইকোর্টের কার্যতালিকায়।

ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ আবেদনের শুনানি:-
বহুল আলোচিত বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাতে এনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। বিষয়টি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় অসংখ্য দিন এসেছে কিন্তু শুনানি হয়নি। যেকোনো সময় এই রিভিউ আবেদনের শুনানি হবে বলে জানা গেছে।

২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাতে এনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়।

আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ৯০৮ পৃষ্ঠার এ রিভিউ আবেদনে ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে ৯৪টি যুক্তি দেখিয়ে আপিল বিভাগের রায় বাতিল চাওয়া হয়েছে।

২০১৭ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ড সংক্রান্ত রিভিউ শুনানি:-
বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা ও রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশনার বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদনের অধিকতর শুনানি হবে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা ও রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশনার বিষয়ে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল মামলা:-
দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়া নির্বাচন নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া জামায়াতের সব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদনটিও আপিল বিভাগে শুনানির জন্য রয়েছে।

গত ৩১ জানুয়ারি দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়া নির্বাচন নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তিন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের জারি করা রুলের চূড়ান্ত রায়ে জামায়াতকে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন ২০১৩ সালের ১ আগস্ট অবৈধ বলে রায় দেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল-হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর (লার্জার) বেঞ্চ। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে জামায়াত।

জামায়াতের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন:-
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রয়েছে।

এ আবেদনের সঙ্গে জামায়াতের আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনের শুনানিও হবে জানিয়েছেন আইনজীবী তানিয়া আমীর।

সম্প্রতি তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ কয়েকজন (রিটকারী) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক দুটি আবেদন করেন। পরে গত ২৬ জুন আবেদনগুলো আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে উপস্থাপন করা হয়। সেদিন চেম্বার আদালত আবেদন দুটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেন। এর মধ্যে ৪২ ব্যক্তি আবেদন দুটিতে পক্ষভুক্ত হতে আবেদন করেন। এই ৪২ ব্যক্তির মধ্যে আছেন– শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, অধিকার কর্মী ও আইনজীবী।

মেয়র তাপসের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ:-
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

গত ৫ জুন ‘একজন চিফ জাস্টিসকেও নামিয়ে দিয়েছিলামথ বক্তব্যকে আদালত অবমাননা উল্লেখ করে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন দায়ের করা হয়। আবেদনে আদালত অবমাননামূলক বক্তব্যের কারণে মেয়র তাপসকে আদালতে তলব করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

বিএনপির শীর্ষ ৭ আইনজীবী নেতার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ:-
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীসহ বিএনপির ৭ আইনজীবী নেতার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনের শুনানির জন্য ১৯ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

৩০ আগস্ট প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ৪ বিচারপতির আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।

গত ৩০ আগস্ট আপিল বিভাগের দুই বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল সমাবেশ করায় বিএনপির ৭ আইনজীবী নেতার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন দায়ের করা হয়। এই ৭ আইনজীবী নেতা হলেন– জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, জাতীয়তবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, জাতীয়তবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সহ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল।
আইনজীবী নাজমুল হুদার পক্ষে অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা যুথি এ আবেদন দায়ের করেন।

আদিলুর-এলানের আপিল ও জামিন শুনানি:-
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানের দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে। পাশাপাশি জামিন চেয়েছেন তারা।

২৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন ভুঁইয়া। শিগগিরই হাইকোর্টে তাদের জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হবে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযানে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে করা মামলায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তাদের ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত এ রায় ঘোষণা করেন।

র‍্যাব হেফাজতে নারীর মৃত্যু : তদন্ত প্রতিবেদনের শুনানি:-
নওগাঁয় র‍্যাব হেফাজতে ভূমি অফিসের সহকারী সুলতানা জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির ৩০২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ১৬ অক্টোবর দিন ধার্য রয়েছে।

গত ২০ আগস্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ দিন ধার্য করেন।

ওইদিন হাইকোর্ট বলেন, এই প্রতিবেদনে স্পর্শকাতর বিষয় আছে। আমরা এখনো খুলে দেখিনি। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। সেজন্য সময় প্রয়োজন। এখন এই প্রতিবেদনের অনুলিপি দেওয়া যাবে না। পরবর্তীতে প্রতিবেদনের অনুলিপি দেওয়া হবে। এরপর আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ১৬ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার শাখার সচিবের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ৩০২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করেন। গত ১৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা:-
বহুল আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু এখনো পেপারবুক পড়া শেষ হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ মামলার পেপারবুক পড়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। অক্টোবর মাসের মধ্যে এ মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষ হয়ে রায়ের জন্য প্রস্তুত হবে বলে জানান তিনি।

বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে।

আমান উল্লাহ আমানের জামিন শুনানি:-
দুর্নীতির মামলায় ১৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানের জামিন আবেদনের শুনানির জন্য ২০ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির মামলায় ১৩ বছরের সাজার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমান। আপিল আবেদনে তিনি জামিন প্রার্থনা করেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানকে কারাগারে পাঠানো হয়।

ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১ এর বিচারক আবুল কাশেমের আদালতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর একই আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান আমান উল্লাহ আমানের স্ত্রী সাবেরা আমান। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ৫ সেপ্টেম্বর চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ক্যান্সারের রোগী বিবেচনায় ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে জামিন দেন। পরে তিনি কারামুক্ত হন।

spot_img

সম্পর্কিত আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ খবর